* ওবায়দুল কাদেরের দেশত্যাগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
* সরকার বলছে, ওবায়দুল কাদের দেশে ছিলেন, জানত না সরকার!
* যে কৌশলে দেশ ছাড়েন ওবায়দুল কাদের, এখন আছেন যেখানে
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় নেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার দেশত্যাগের পর কার্যত দিশাহারা হয়ে পড়েন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। দলের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা না আসায় প্রথমে দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে চলে যান তারা। ইতোমধ্যে অনেকেই দেশ ছাড়েন এবং অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আওয়ামী লীগের পলাতক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে হৈ চৈ শুরু হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি থাকা সত্ত্বেও ওবায়দুল কাদেরের দেশত্যাগ বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ বিষয়ে শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আমরা আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি যে ওবায়দুল কাদের তিন মাস দেশেই ছিলেন বলে আমাদের কাছে প্রমাণ আছে। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি থাকা সত্ত্বেও কেন তাকে গ্রেফতার করা হয়নি বা তিনি পরে কীভাবে দেশের সীমান্ত অতিক্রম করলেন সে বিষয়ে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যাখ্যা দিতে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, যদি কেউ আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও কাউকে পালাতে সাহায্য করেন, তাহলে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি আরো বলেন, শেখ হাসিনার নির্দেশে ও পরিকল্পনায় বিভিন্ন সময় ওবায়দুল কাদেরসহ মন্ত্রী পরিষদের বিভিন্ন সদস্য মানুষকে গুম ও হত্যা ইত্যাদি করতে সরাসরি সাহায্য করেছেন। যারা এই গুমের ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের তথ্য কমিশনের কাছে এসেছে এবং তা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ নিয়ে অবশেষে মুখ খোলেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের দেশে থাকার বিষয়ে সরকার অবগত ছিল না। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি সরকার জানলে তাকে গ্রেফতার করত। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বিভাগীয় আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিশেষ সভায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এরআগে গত ৫ আগস্টের পর থেকে দেশেই অবস্থান করছিলেন নানান সময়ে বিতর্কিত ও সমালোচিত সাবেক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিন মাস আত্মগোপনে থাকার পর গত ৮ নভেম্বর তিনি সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাড়ি দেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ওবায়দুল কাদেরের দেশে থাকার বিষয়টি সরকার জানত না। জানলে তাকে গ্রেফতার করা হতো। এর আগে গত ১৯ অক্টোবর রাজশাহীর বিজিবি সদর দফতর পরিদর্শনের সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের খোঁজ দিতে পারলে সাংবাদিকদের পুরস্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি জানান, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে যদি কেউ ওবায়দুল কাদেরের অবস্থান জানাতে পারেন, তবে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। সে সময় সাংবাদিকরা ওবায়দুল কাদেরের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। কিন্তু আপনারা তো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করেন। যদি আমাকে ওবায়দুল কাদের কোথায় আছেন তা জানাতে পারেন, আমি আপনাদের একটি পুরস্কার দেবো। আপনারা আমাদের অনেক তথ্য দিতে পারেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে আনা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘ইন্টারপোলকে আবারো সহায়তার কথা জানানো হয়েছে। পুলিশের পুরোদমে কাজে ফেরা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশের মনোবল আগে থেকে বেড়েছে। তবে সময় লাগবে পুরোদমে কাজ শুরু করতে। তিনি বলেন, পুলিশের যারা পালিয়ে আছেন তারা আমাদের কাছে অপরাধী, তাদের পাওয়া গেলেই আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর আগে সচিবালয়ের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত বিশেষ প্রেস ব্রিফিংয়ে মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে আগামী ৫ কার্যদিবসের মধ্যে কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত কমিটিতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের রাখা হবে। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যের সংখ্যা বেশি হবে বলে জানান তিনি। তবে পুনঃ-তদন্তের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত না। এ আদেশ দেয়ার এখতিয়ার আদালতের’ উল্লেখ করেন জাহাঙ্গীর আলম।
যে কৌশলে দেশ ছাড়েন ওবায়দুল কাদের, এখন আছেন যেখানে: গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তার দেশত্যাগের পর কার্যত দিশাহারা হয়ে পড়েন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। দলের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা না আসায় প্রথমে দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে চলে যান তারা। অনেকেই দেশ ছাড়েন। গত ৫ আগস্টের ঠিক পরপরই দেশত্যাগ করেছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন আহমেদ নাসিম ও আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা নারায়ণগঞ্জের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ অনেকে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কোথায় আছেন, এ নিয়ে তখন বড় জিজ্ঞাসা ছিল। তিনি দেশে না বিদেশে এমন প্রশ্ন ছিল রাজনৈতিক মহলে। বিভিন্ন সময়ে তাকে নিয়ে নানা গুজব আর গুঞ্জন ছড়িয়েছে। গণমাধ্যমের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী গণঅভ্যুত্থানের পর তিন মাস ৫ দিন তিনি দেশেই ছিলেন। এই সময়ে তিনি নিরাপদেই ছিলেন। দলের সভাপতির মতো তিনিও ভারতে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেছেন ওই সময়ে। যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন দলীয় সভাপতির সঙ্গে। সেখান থেকে সাড়া মিলেনি। প্রাপ্ত সূত্র অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন নিয়ে ওবায়দুল কাদেরের দেয়া বক্তব্যে যারপরনাই বিরক্ত ছিলেন শেখ হাসিনা। ‘ছাত্রদের আন্দোলন দমাতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট’ ওবায়দুল কাদেরের এমন বক্তব্যেই আন্দোলনে আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছিল বলেই দলটির নেতারা মনে করছেন। গত ৮ নভেম্বর ওবায়দুল কাদের মেঘালয়ের রাজধানী শিলং হয়ে কলকাতায় পৌঁছান। এর আগে তিনি এক বিশেষ স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন। দেশ ছাড়ার সবুজ সংকেত আসার পর সড়কপথে তিনি বিশেষ ব্যবস্থায় পৌঁছান শিলং। সেখান থেকে যান কলকাতা।
জানা গেছে, দিল্লি নয়, কলকাতাতেই তিনি অবস্থান করবেন। ভারত সরকারের কাছে তার জন্য কেউ কেউ লবিং করছিলেন। এক্ষত্রে শেখ হাসিনা কোনো আগ্রহ দেখাননি। এরআগে গত ৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের আগ্রাবাদ অ্যাক্সেস রোডের এ আর টাওয়ারে একটি বাড়িতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অবস্থান করছেন এমন সন্দেহে অভিযান চালায় পুলিশ। পরে তাকে না পেয়ে তার স্ত্রীর বড় ভাই নুরুল হুদা বাবুকে (৭০) থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। ওই সময় নুরুল হুদাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হলেও ১০ নভেম্বর সকালে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। পরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোতোয়ালি থানার ওসি ফজলুল কাদের।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

ওবায়দুল কাদেরের দেশত্যাগে হৈ চৈ
- আপলোড সময় : ১৭-১২-২০২৪ ১০:১৫:৫৮ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৭-১২-২০২৪ ১০:১৫:৫৮ অপরাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ